কুড়িগ্রামে বাল্যবিয়ে করতে গিয়ে পিটুনি খেলেন খাদ্য কর্মকর্তা

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২২, ১২:৫২ দুপুর
আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২২, ১২:৫২ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

কিশোরীর বাবার ভাষ্য, কুড়িগ্রাম শহরে ৩০ শতক জমি, ১০ ভরি স্বর্ণালংকার ও টাকা দেওয়ার প্রলোভনে মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন এই কর্মকর্তা।

কুড়িগ্রামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক খাদ্য কর্মকর্তা বাল্যবিয়ে করতে এসে জনতার পিটুনি খেয়ে পালিয়েছেন।

মঙ্গলবার রাতে রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের বড়াইকান্দী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

পরে রৌমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শালু ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই কর্মকর্তাকে জনরোষ থেকে রক্ষা করেন। এ সময় অপর দুই খাদ্য কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে অনুষ্ঠান স্থল ত্যাগ করেন এই চেয়ারম্যান।

পিটুনির শিকার ওই খাদ্য কর্মকর্তার নাম ইসকে আব্দুল্লাহ (৫৪)। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলার রাণী শংকৈল উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কর্মরত আছেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কুড়িগ্রাম শহরে ৩০ শতক জমি, ১০ ভরি স্বর্ণালংকারসহ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই গ্রামের এক কিশোরীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন।

তার সঙ্গে কুড়িগ্রাম সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুব হাসান এবং নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান ছিলেন।

তবে ইসকে আব্দুল্লাহর ভাষ্য, “উভয়ের সম্মতিতে বিয়েটা হচ্ছিল। আমার প্রথম স্ত্রীর এতে সম্মতি আছে। তার দুটি অপারেশনের পর তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম। তার অনুমতি নিয়ে আমি দ্বিতীয় বিয়ে করতে এসেছি।”

মেয়ের বয়স কম – এটা তার জানা ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একটু হট্টগোল হয়েছে। আমরা পরবর্তীতে কোর্টের মাধ্যমে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করব।”

ইসকে আব্দুল্লাহ দিনাজপুর সদরের সুইহারী (খালপাড়া) গ্রামের প্রয়াত হাফিজ উদ্দিনের ছেলে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রথম স্ত্রীর ভুয়া অনুমতি সনদ দেখিয়ে এবং কিশোরীকে ফুসলিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করতে আসায় ওই কর্মকর্তাকে গণধোলাই দেওয়া হয়েছে।

ইসকে আবদুল্লাহ স্ত্রী কামরুন নাহার জানান, তাদের তিন সন্তানের মধ্যে এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। আরেক মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ণরত। একমাত্র ছেলে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়েন।

তিনি অভিযোগ করেন, তার স্বামী কিছুদিন ধরে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দিয়ে আসছিলেন। এতে সম্মতি না দেওয়ায় শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। এ নিয়ে দিনাজপুর থানায় যৌতুক ও নারী নির্যাতন আইনে মামলা করা হয়েছে।

শৌলমারী ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য ইউনূছ আলী জানান, ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় শৌলমারী এমআর স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ইসকে আব্দুল্লাহ। এর সুবাদে পরীক্ষা কেন্দ্রেই পরিচয় হয় ওই এসএসসি পরীক্ষার্থীর সঙ্গে। পরে ওই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোবাইল নম্বরও নেন ওই কর্মকর্তা।

“এরপর বিভিন্ন সময়ে মোবাইলে কল দিয়ে তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এর জেরে মঙ্গলবার (৯ অগাস্ট) সন্ধ্যার দিকে তিন সদস্যের বরযাত্রী নিয়ে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে ওই শিক্ষার্থীর বাড়িতে উপস্থিত হন।”

তিনি জানান, তিনি প্রথম স্ত্রীর ভুয়া অনুমতির প্রত্যয়নপত্র নিয়ে এসেছেন। তার সঙ্গে আসা দুই খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা কুড়িগ্রাম সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুব হাসান এবং নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তবে তারা বিয়ের সাক্ষী হতে রাজি হননি।

“তার কোনো স্বজনও আসেননি এবং ওই শিক্ষার্থীর বিয়ের বয়স না হওয়ায় তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এ সময় স্থানীয়রা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে পিটুনি দেয়।”

এই ইউপি সদস্য আরও বলেন, জনতার রোষানল থেকে তাকে উদ্ধার করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন রৌমারী সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শালু।


শহিদুল ইসলাম শালু বলেন, ওই কর্মকর্তা বিয়ে করতে এসে জনতার রোষানলের শিকার হয়েছেন। পরে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থল থেকে তাদের উদ্ধার করে বাড়িতে ফেরৎ পাঠানো হয়েছে।

ওই কর্মকর্তার সঙ্গে বরযাত্রী হিসেবে আসা কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুব হাসান ও নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান বলেন, তিনি তার এক আত্মীয়র বাড়িতে দাওয়াতের কথা বলে তাদের রৌমারীতে নিয়ে আসেন।

মাহবুব হাসান বলেন, “পরে দেখি তিনি বিয়ে করার উদ্দেশ্যে এসেছেন। এ সময় আমাদের দুজনকেই বিয়ের সাক্ষী হতে বলেন। আমরা সরকারি কর্মকর্তা, বাল্য বিয়েতে সাক্ষী হতে রাজি না হওয়ায় স্থানীয়দের সাথে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।

“এ সময় রৌমারী সদর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শালুর সহযোগিতায় আমরা ঘটনাস্থল থেকে সরে আসি।”

বিয়ের কনে ওই শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, “কুড়িগ্রাম সদরে ৩০ শতক জমিতে বাড়ি করে দেবেন। ১০ ভরি স্বর্ণাঙ্কারসহ মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে আমার কোমলমতি মেয়েকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এই সুবাদে তার প্রথম স্ত্রীর ভুয়া অনুমতি সনদসহ দুজন লোককে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে আসেন। এ সময় গ্রামবাসীর সঙ্গে বাগবিতন্ডার এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়।”

এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম বলেন, রাণী শংকৈল উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুদিনের ছুটিতে রয়েছেন। এ ঘটনার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, নিউজ টিপিবি এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়