স্মার্টফোনের জালে বন্দি শৈশব!

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২২, ০৬:৩৭ বিকাল
আপডেট: সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২২, ০৬:৩৭ বিকাল
আমাদেরকে ফলো করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

রাজধানীর একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ। সকালে স্কুল থেকে ফিরে আর সময় কাটে না তার। এলাকায় একটি মাঠ আছে। তবে পরিবারের কেউ সময় দিতে না পারায় খেলতে যেতে পারে না তানভীর। বিনোদন ও সময় কাটানোর একমাত্র মাধ্যম তাই স্মার্টফোন।

শিশুটির মা সামিরা আক্তার বলেন, তানভীর স্কুলে যায় সকাল সাড়ে ৮টায়। এরপর বাসায় ফেরে সাড়ে ১০টায়। এসেই মোবাইল ফোন নিয়ে বসে পড়ে। এটা ওর অভ্যাস হয়ে গেছে, ফোন হাতে নিয়েই সে খায়। এমনকি ঘুমের আগেও তার হাতে মোবাইল ফোন থাকে। এলাকায় একটা মাঠ থাকলেও আমরা সঙ্গে যেতে পারি না, আর তাকে একাও ছাড়তে পারি না। তাই তানভীর বাসায় নিজে নিজে খেলাধুলা করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক কিছু উন্নতি হলেও সার্বিকভাবে তারা সামাজিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। শিশুদের শারীরিক কিংবা মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত জরুরি। তবে শহরের, বিশেষ করে ঢাকা শহরের শিশুরা সেই সুযোগ পায় না। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি হচ্ছে তার পরিবারের সময়ের অভাব, অন্যটি খেলার জন্য উন্মুক্ত স্থান নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় খেলার মাঠ থাকে না। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নেই খেলার স্থান। ফলে বাধ্য হয়েই ডিভাইসে বন্দি হচ্ছে শৈশবের জীবন।

শিক্ষা নিয়ে কাজ করা এডুক্যান ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক (লার্নিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) ড. জি এম নিজাম উদ্দিন বলেন, এখন শহরের স্কুলগুলোতে খেলার জায়গা নেই। ফলে শিশুদের কাছে স্কুল মানেই বই পড়ো, কোচিং করো, বাসায় এসে পড়ো, সারাদিন পড়ো। এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজে গুরুত্ব নেই। আমরা পরীক্ষা ও ফলাফল দিয়েই শিক্ষার্থীদের সাফল্য বিবেচনা করি। পরিবারও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত, ফলে বইয়ের বাইরে শিশুদের কোনো জীবন নেই। একটা বাসায় বসে পড়ে, এরপর স্কুলে সারাদিন একটা ক্লাসের মধ্যে থাকে। এভাবে থাকতে থাকতে শিশুদের বিনোদনের দরকার হয়। সেই বিনোদন তারা খুঁজছে মোবাইল ফোন, ট্যাবে ভিডিও দেখে কিংবা গেমস খেলে।

‘বাবা-মায়েরাও মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাই শিশুও তাদের অনুসরণ করে। এখন শিশুদের লালন-পালনেও নজর দিতে হবে। বাবা-মায়েরা তাদের শিশুসন্তানকে নিয়ে ছুটির দিনে ঘুরতে যেতে পারেন। শহরে খেলার মাঠ সেভাবে নেই, রাস্তায় হাঁটার জায়গাটাও নেই। এমনকি অল্প কিছু খেলার মাঠ যা ছিল তাও অনেকে দখল করে রেখেছেন। ফলে খোলা জায়গা থাকছে না।’

তিনি বলেন, আমাদের স্বাভাবিক জীবন ও শিক্ষাজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। সামাজিকতা এখন কম হয়। আগে যেমন বিভিন্ন উৎসবে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যেত, বাইরে ঘুরতে যেত- সেগুলো এখন কমে গেছে। বাইরে গেলেও রেস্টুরেন্টে যায়, সেখানেও আবদ্ধ হয়ে বসে থাকা। পরিবার মোবাইল ফোন দিয়ে শিশুকে শান্ত রাখছে, এটা এক ধরনের সহজ সমাধান। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমাদের লাইফস্টাইলের পরিবর্তন ঘটছে। খেলাধুলার জায়গা নেই, আবার পরিবারও খুব ব্যস্ত। ফলে শিশুরা নিঃসঙ্গভাবে বড় হচ্ছে। সবার এদিকে নজর দেওয়া দরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত জরুরি। উন্মুক্ত স্থানে খেলার সুযোগ না পাওয়ায় তারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর অধিকাংশ স্কুলে খেলাধুলা বিষয়ক কোনো ক্লাস নেই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মহানগরের কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ন্যূনতম শূন্য দশমিক ১৫ একর এবং ঢাকার বাইরে শূন্য দশমিক ৩৩ একর জমি থাকা প্রয়োজন। অথচ বাস্তবচিত্র উল্টো। অধিকাং শিশুর বাড়ির কাছে কোনো খেলাধুলার জায়গাই নেই।

অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু বলেন, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ করার একটা স্বপ্ন দেখাচ্ছে বা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের ব্যবহার করতে হবে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের জন্য বা সহজলভ্য করার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের যে জ্ঞান, ধারণা বা প্রশিক্ষণ লাগবে, সেটি খুবই সীমাবদ্ধ। ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে সাইবার ক্রাইম বাড়ছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০টি করে রিপোর্ট হচ্ছে। আত্মহত্যার মতো ঘটনা বাড়ছে। যেটা দেখা যাবে না সেটার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে, শিশুদের তো আরও বেশি থাকে। তাদের ডিভাইস ব্যবহারে যে মনিটরিং সেটি পরিপক্ব নয়। আমরা যেটা মনিটরিং করবো সেটা নিয়ে যেসব এজেন্সি কাজ করে তাদেরও কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। এটি না করা পর্যন্ত অপরাধ বন্ধ করতে পারবো না। আমাদের ভাবতে হবে কোন কোন বিষয়ে আমরা শিশুদের অ্যাকসেস দেবো। যেটা শিশুদের লেখাপড়া, দেশপ্রেম থেকে সরিয়ে নিয়ে মাদক বা কিশোর গ্যাংয়ে নিয়ে যায়, সেসব ক্ষেত্রে শক্তভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে আমরা বিশ্বের যে কোনো কিছুই পেতে পারি। পৃথিবীতে ভালো কাজ যেমন হয়, অনেক খারাপ কাজও হয়। আমরা কীভাবে ভালো বিষয়গুলো পেতে পারি। কীভাবে আমরা শিক্ষিত, দক্ষ, সচেতন ও সমাজ গড়ার, পরিবার গড়ার কিংবা রাষ্ট্র গড়ার জন্য উৎপাদনক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়তে পারি- এ বিষয়গুলো আমরা ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে শিশুদের কিংবা কিশোর-কিশোরীদের উপহার দিতে পারি। তারা যাতে বিপথে চলে না যায়, এজন্য আমাদের যথাযথ নজরদারি থাকতে হবে। সেটা শিক্ষকদের মাধ্যমে হতে পারে, বিটিআরসির মাধ্যমে হতে পারে। বাবা-মায়ের মাধ্যমেও হতে পারে। কিন্তু সব বাবা-মা এতটা শিক্ষিত এবং প্রযুক্তিতে দক্ষ নয়। ফলে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে বাবা-মায়ের কিন্তু ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিংবা মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে একটা বড় গ্যাপ থাকে।

তানভীরের মতো একই অবস্থা ছয় বছর বয়সী সুমনা ইসলামের। দিনের অর্ধেক সময়ই মোবাইল ফোনে কাটে তার। ইউটিউবে বিভিন্ন কনটেন্ট দেখে ইংরেজিতে কিছুটা কথা বলার চেষ্টা করে সে। এতে কিছুটা খুশি সুমনার পরিবার। তবে ইউটিউবের কনটেন্টে যে জীবন দেখে বড় হচ্ছে সুমনা, সেভাবেই নিজেরও চাহিদা তৈরি করছে সে। এক্ষেত্রে অনেকটা বিপত্তিতে পড়তে হচ্ছে পরিবারকে।

সুমনার মা রোজিনা শৈলী বলেন, আমার বাচ্চা শিশু শ্রেণিতে পড়ছে। কিন্তু সে বেশ ভালোই ইংরেজি বলতে পারে। এটা খুব ভালো একটি দিক। কিন্তু মাঝে মধ্যে সে কিছু আবদার করে বসে, যা ইউটিউবে দেখে শেখে সে। তার আবদার করা জিনিস না পেলে খুব বেশি প্রতিক্রিয়াও দেখায় অনেক সময়। আমার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ফলে সংসারের যাবতীয় কাজ আমাকেই সামলাতে হয়। সবমিলিয়ে শিশুর সঙ্গে সময় কাটানোর তেমন সুযোগ হয় না। তাই বাধ্য হয়েই মোবাইল ফোন দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখি। তবে এক্ষেত্রে একটি সমস্যা বেশি দেখতে পাচ্ছি, সুমনা মানুষের মধ্যে যেতে চায় না। কারও সঙ্গে মিশতে চায় না, অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে এখন স্কুল-কলেজের যে সিস্টেম, এই সিস্টেমে শিশুদের বিনোদন, ঘোরাফেরা, খেলাধুলার সুযোগ নেই। ফলে বাধ্য হয়েই শিশুরা ভার্চুয়াল জগতে এর বিকল্প খোঁজে। মোবাইল ফোনে নানা গেমস থাকে। সেগুলোতে তারা আসক্ত হয়ে পড়ে।

‘এছাড়া অনেক বাবা-মা সন্তানকে সময় দেন না। তাহলে সন্তান কার সঙ্গে সময় কাটাবে? পরিবারও এখন অনেক ছোট হয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবারে একটি সন্তানই থাকে। এই শিশুর সঙ্গী নেই, তারা বাবা-মা কিংবা ভাই-বোনের সঙ্গ পায় না। তবে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলো ডেভেলপ করে, এগুলো চালাতে হলে তাদের অনেক বুদ্ধি ডেভেলপ হয়। কিন্তু মানুষ হিসেবে তো শুধু বুদ্ধির বিকাশ না, সামাজিক, আবেগ, শারীরিক, আত্মিক বিকাশও দরকার। ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে এগুলো কিন্তু হয় না। একটা বিকাশ হলেও অন্যগুলো কিন্তু হচ্ছে না। ফলে এই বিষয়গুলোর ফলে ভবিষ্যতে যা হবে তা ভয়াবহ।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, নিউজ টিপিবি এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়